এনআইডি বাধ্যতামূলক হচ্ছে সরকারি চাকরির নিয়োগে: কমবে জটিলতা ও বাড়বে সচ্ছতা
সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার।
এনআইডিকেই বয়স ও পরিচয় প্রমাণের প্রধান দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আগামীকাল বুধবার (৩০ জুলাই) এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি), মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ ও আইন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতে পারে।
কেন সরকারি চাকরিতে এনআইডি বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে?
বর্তমানে সরকারি চাকরিতে নিয়োগের সময় জন্ম সনদ বা এসএসসি সার্টিফিকেটকে বয়সের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই ডকুমেন্ট দিয়েই অনেকে এতদিন চাকরীতে প্রবেশ করেছেন।
কিন্তু দেখা যাচ্ছে অনেকের একাধিক ডকুমেন্টে ভিন্ন ভিন্ন জন্ম তারিখ থাকায় পরবর্তীতে বেতন-ভাতা নির্ধারণ (Pay Fixation), পেনশন ও অন্যান্য সুবিধা প্রদানে জটিলতা তৈরি হয়।
তাছাড়া, অনেক সময় চাকরী প্রার্থীরা জন্ম নিবন্ধন বা এসএসসি সার্টিফিকেটে এক জন্ম তারিখ দিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে Pay Fixation করার সময় দেখা যায় এনআইডিতে জন্ম তারিখ ভিন্ন। পে ফিক্সেশন করার জন্য আবার জাতীয় পরিচয় পত্র বা এনআইডি সংশোধের জটিলতা তৈরি হয়।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এস এম হুমায়ুন কবীর বলেন,
চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা IBAS সিস্টেমের মাধ্যমে দেওয়া হয়, যেখানে এনআইডি নম্বর ও জন্ম তারিখ ব্যবহার করা হয়। যদি নিয়োগপত্র ও এনআইডির তথ্য না মেলে, তাহলে বেতন বন্ধ হয়ে যায়। আমরা চাই নিয়োগের সময়ই এনআইডি যাচাই করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে সমস্যা না হয়।
সরকারি চাকরিতে NID বাধ্যতামূলক হলে যা হবে
১. এনআইডি তথ্য যাচাই বাধ্যতামূলক: নিয়োগের সময় প্রার্থীর এনআইডি কার্ডের জন্ম তারিখ, নাম ও অন্যান্য তথ্য সার্ভিস বুক বা নিয়োগপত্রের সাথে মিলাতে হবে।
২. সংশোধনের সুযোগ সীমিত: নতুন নিয়ম চালু হওয়ার পর যদি কেউ ভুল তথ্য দিয়ে চাকরি পান, তাহলে পরবর্তীতে তাদের এনআইডি সংশোধন করা যাবে না।
৩. সকল মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়: ইতিমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য বিভাগ এনআইডি ভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এখন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কেও এই নীতিতে সম্মত করতে চাইছে ইসি।
বর্তমানে এনআইডি বাধ্যতামূলক না থাকায় যে সমস্যা হচ্ছে
বেতন বন্ধ
অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন আটকে যায় শুধু এনআইডি ও সার্ভিস বুকের তথ্য অমিলের কারণে। কারণ, চাকরীতে প্রবেশের সময় ভিন্ন জন্ম তারিখ দিয়ে জন্ম নিবন্ধন প্রদর্শন করে। পরে পে ফিক্সেশনের ক্ষেত্রে এনআইডির ভিন্ন জন্ম তারিখের কারণে বেতন ফিক্সেশন করা যায়না বলে, বেতন বন্ধ হয়ে থাকে।
জন্ম তারিখের গোলযোগ
কেউ ভোটার হওয়ার সময় এক তারিখ, চাকরিতে আবেদনের সময় আরেক তারিখ ব্যবহার করলে আইনি জটিলতা তৈরি হয়। যেমন:
সমস্যা ১: কিছু ক্ষেত্রে চাকরিজীবীর প্রয়োজন অনুসারে জন্ম তারিখ সংশোধন করা হলে তার বয়স ভোটার নিবন্ধনকালে ভোটার হওয়ার ন্যূনতম বয়সের নিচে চলে আসে, সেক্ষেত্রে উক্ত ভোটারের ভোটার হওয়ায় অযোগ্যতার প্রশ্ন সামনে চলে আসে, যা আইনগতভাবে অবৈধ। তখন তার চাকরীর যোগ্যতাও হারানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়।
সমস্যা ২: অনেকে চাকরি পাওয়ার পর চাহিত জন্ম তারিখ অনুসারে এনআইডি কার্ড সংশোধন করতে গেলে আবেদনকারীর পিতা/মাতার বয়সের সাথে তার নিজের বয়সের অসামঞ্জস্যতা পরিলক্ষিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে সহোদর ভাই-বোনের বয়সের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা অনুসারে বয়সের অমিল দেখা দেয়।
অভিযোগ ও মামলা
তথ্য গোপন করার কারণে কিছু ক্ষেত্রে চাকরি বাতিলের মামলাও হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কর্তৃক নিয়োগ বাতিল চেয়ে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ বরাবর এবং এনআইডি কার্ডের তথ্য গোপন করার জন্য নির্বাচন কমিশন বরাবর অভিযোগ ও মামলা দায়ের করার মত ঘটনার উদ্ভব হচ্ছে।
ইসির পরিকল্পনা
নির্বাচন কমিশন একটি সময়সীমা নির্ধারণ করবে, যার পরে কোনো প্রার্থী এনআইডির তথ্য গোপন করে চাকরি পেলে তা সংশোধন করা হবে না। ইসির এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা চাই, নিয়োগের সময়ই সব তথ্য যাচাই করা হোক। এতে করে দুর্নীতি কমবে এবং যোগ্য ব্যক্তিরা সুযোগ পাবেন।”
শেষ কথা
আগামীকালের বৈঠকে যদি সব মন্ত্রণালয় সম্মতি দেয়, তাহলে দ্রুতই বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস (বিএসআর) সংশোধন করে এনআইডিকে বাধ্যতামূলক প্রমাণপত্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এতে সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
সরকারি চাকরিতে এনআইডি বাধ্যতামূলক করলে একদিকে যেমন জালিয়াতি রোধ হবে, অন্যদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভোগান্তিও কমবে। এটি একটি সময়োপযোগী ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।